শেরপুরের নকলা উপজেলার কায়দা উত্তরপাড়া এলাকার শহিদ মিয়ার ছেলে সুমন মিয়া বিভিন্ন মহাসড়ক, আঞ্চলিক ও গ্রামীণ সড়কের পাশে স্থাপিত ভেঙ্গে যাওয়া ও অস্পষ্ট মাইলফলক ও সাইবোর্ড স্বেচ্ছায় ঠিক করার পাশাপাশি দৃশ্যমান করে দেওয়ার কাজে নিজেকে আত্মনিয়োগ করায় সবার নজর কেড়েছেন। এযেন মানবিক উদ্যোগে সাইনবোর্ড ও মাইলফলক সংস্কারে সুমনের নীরব বিপ্লব।
কাজের ফাঁকে সে প্রায় প্রতিদিন অস্পষ্ট হয়ে যাওয়া কোন না কোন সাইনবোর্ড বা মাইলফলক ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করেন। তাছাড়া কোন সাইনবোর্ড বা মাইলফলক ভেঙ্গে গেলে সেটা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিজ খরচে ঠিক করে দিচ্ছেন। স্বেচ্ছায় এমন কাজ করায় প্রশংসায় ভাসছেন তরুণ স্বেচ্ছাসেবক সুমন মিয়া।
সুমন বর্তমানে নকলা মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে কর্মরত আছেন। চাকরি সময় শুরুর আগে বা পরে এবং ছুটির দিন তার পুরাতন মোটরসাইকেলটি নিয়ে সে বেড়িয়ে পড়েন রাস্তায়। সাথে রাখেন একটি ব্যাগ আর ব্যাগে ভরেনেন দা, কাচি, কুদাল, পানির বোতল, মগ, লাল-সাদা ও কালো রঙের ছোট ছোট কৌটাসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। যেখানে ভাঙ্গা কোন সাইনবোর্ড ও মাইলফলক দেখেন সেখানে থেকে তা ঠিক করে দেন। সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষে বিভিন্ন দপ্তর কর্তৃক রাস্তার পাশে স্থাপিত বা সড়ক বিভাগ কর্তৃক স্থাপিত সাইনবোর্ডের লেখা মুছে গেলে বা লেখা অস্পষ্ট হয়ে গেলে ধুয়েমুছে পরিষ্কার করে দৃশ্যমান করেন। এছাড়া কোন লেখা উঠেগেলে নিজ হাতে হুবহু বর্ণ ও রঙে নিজের হাতে লিখেদেন।
নিজের সব কাজ রেখে রাস্তার পাশে স্থাপিত ভেঙ্গে যাওয়া ও অস্পষ্ট মাইলফলক ও সাইবোর্ড স্বেচ্ছায় ঠিক করার বিষয়ে আগ্রহ সৃষ্টির কারন সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান, সে কয়েক বছর আগে মোটরসাইকেলে রাইড শেয়ার করতেন। তখন অনেক যাত্রী পথিমধ্যে দূরত্ব সম্পর্কে জানতে চাইতেন। কিন্তু মাইলফলক ও সাইবোর্ড ভেঙে যাওয়ায় বা লেখা অস্পষ্ট থাকায় বা লতানো গাছপালার আড়ালে পড়ে যাওয়ায় এবং মোটরসাইকেল চলমান থাকায় তিনি সহজে উত্তর দিতে পারতেন না। ফলে তাকে নতুন রাইডার ভেবে যাত্রীদের মনের মধ্যে অদৃশ্য হতাশা কাজ করতো বলেও তিনি জানান। তাই রাস্তার পাশের মাইলফলক ও সাইনবোর্ড সংস্কার ও পরিষ্কার করার পাশাপাশি মাইলফলক ও সাইনবোর্ডের কাছাকাছি গাছপালা রোপন করা থেকে বিরত থাকার বা সরকারি ভাবে বিরত রাখার দাবি সুমনের।
তরুণ স্বেচ্ছাসেবক সুমন মিয়া বলেন, ‘রাস্তার পাশে স্থাপিত অধিকাংশ সাইনবোর্ড বা মাইলফলক দীর্ঘদিন পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করার অভাবে তাতে ময়লা, ধুলাবালি, পোস্টার, রঙের আঁচড় কিংবা লেখালেখিতে বা লতানো গাছপালায় ঢেকে যায়। কিছু কিছু মাইল ফলক ও সাইনবোর্ড ভেঙ্গে মাটিতে পড়ে থাকতেও দেখা যায়। ফলে দূরত্ব, গন্তব্য ও দিকনির্দেশনা সমূহ পড়া যায় না। এতে যাত্রী, চালক ও জরুরি সেবায় নিয়োজিত ব্যক্তিরা বিভ্রান্তির শিকার হচ্ছেন। বিশেষ করে বহিরাগত যাত্রী বা পথচারীদের সঠিক তথ্য না পেয়ে সময় ও জ্বালানি অপচয়ের পাশাপাশি দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে। অনেক সময় রাস্তার মোড় বা পার্শ্বরাস্তার চিহৃ দেখতে অসুবিধা হওয়ায় আমি নিজেও কয়েকটি ছোট দুর্ঘটনার মুখোমুখি হয়েছি। এথেকেই আমার কাছে মনে হয়েছে, বিভিন্ন মহাসড়ক, আঞ্চলিক ও গ্রামীণ সড়কের পাশে স্থাপিত ভেঙ্গে যাওয়া ও অস্পষ্ট মাইলফলক ও সাইবোর্ড ঠিক করার পাশাপাশি দৃশ্যমান করে দিতে পারলে হয়তো এই সমস্যা কিছুটা হলেও দূর হবে। এর পরে আমি এই কাজে নিজেকে নিয়োগ করি। আগে অনেকে পাগলামী ভেবে হাসাহাসি করতেন। তবে এখন আমার কাজ থেকে সব্ াখুশি। সাবাই আমাকে দেখলে দূর থেকে কাছে আসেন, গল্প করেন এবং কাজের প্রশংসা করার পাশাপাশি ধন্যবাদ জানান। এটাই আমার পাওয়া। আমার এই ছোট কাজটি আজ জনমনে নাড়া দিয়েছে। আজ আমি স্বার্থক বলে মনে করি।’
সচেতন মহলের অনেকে জানান, দেশের বিভিন্ন সড়কের পাশে সরকারি খরচে মাইল ফলক ও দিকনির্দেশনামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন করা হয়। এরপরে আর কোন তদারকি করা হয়না। ফলে এগুলোর নষ্ট হয়ে যায় এবং কিছু কিছু মাইল ফলক ও সাইনবোর্ড ভেঙ্গে মাটিতে পড়ে যায়। ফলে রক্ষণাবেক্ষনের অভাবে সরকারের তথা সড়ক বিভাগ বা এলজিইডি বিভাগের এককালীন ব্যয় করা প্রচুর টাকা নষ্ট হয়। অথচ নিয়মিত পরিষ্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ করলে সড়কের সমস্যা সমাধানসহ সরকারের অর্থ অপচয় রোধ করা সম্ভব। তাই রাস্তার পাশের সব মাইল ফলক ও সাইনবোর্ড সংস্কার ও পরিষ্কার করে লেখাগুলো স্পষ্ট করার দাবী সর্বমহলের।