নিয়মিত কাজ করতে করতে প্রায়ই মনে হয়, প্রাকৃতিক কোন খোলামেলা পরিবেশে ঘুরে আসতে পারলে বা প্রকৃতি থেকে শিক্ষা গ্রহন করতে পারলে মন্দ হতোনা। আর তাইতো সুযোগ পেলেই সবার প্রকৃতির সাথে মিশে যেতে মন চায়। তাই দূরে কোথাও বা প্রাকৃতিক কোন পরিবেশে হারিয়ে যেতে পারলে মন্দ হয় না। আর তাইতো নিজ নিজ কর্মব্যস্ততার মধ্যে, যেকোন মাধ্যমে যখন কোন মনোরম পরিবেশের দৃশ্য বা অরণ্যের ছবি নজরে পড়ে, তখন মনে হয় সমমনা সবাই মিলে যদি দূরে কোথাও ঘুরে আসা যেতো, কতইনা আনন্দ হতো! ঝরনার ছবি দেখে করুণ চোখে চেয়ে থাকা, সাগরের ছবি দেখে বুকের ভেতরটা হাহাকার করে ওঠে সবার। বিশেষ করে অরণ্যের কোন চিত্র দেখে মনে হয় হারিয়ে যাই সেখানে। এভাবেই হারিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে আমরা প্রতিদিন নিজ নিজ কাজের পিছনে ছুটে বেড়াই, অফিস করে যাই নিয়মিত।
এরই ফাঁকে সত্যিই একদিন সাংসারিক সকল কাজ ফেলে রেখে ঘুরে বেড়ানোর দিন আসে। আর সেই সুযোগটাও কিনা হয় বাংলা-ভারত সীমান্ত জেলা শেরপুরের পর্যটন এলাকা গারো পাহাড়ের গজনী অবকাশে দিনব্যাপী ঘুরে বেড়ানোর। বয়সকে ভুলে সব বয়সের সমমনা সবাই মিলে ফ‚র্তি করার, নাচ-গান করার। আর অরণ্যের মাঝে খোলা আকাশের নিচে একসাথে বসে খাবার খাওয়ার।
বলছি ২১ নভেম্বর, অফিস ছুটির দিন শুক্রবারের কথা। এই দিনটিতে নিজস্ব পারিবারিক কাজ ছাড়া তেমন কোনো কারো কাজ থাকেনা। অভিজ্ঞ ও কর্মঠ সমমনা বন্ধুদের সিদ্ধান্তের প্রতি অনুগত হয়ে আমরা এ শুক্রবারকেই ঠিক করি গজনী অবকাশের চোখ জুড়ানো বনে হারিয়ে যেতে। এ দিন যা হয় তার সবটুকুই সব বয়সের সবাই মিলে আনন্দ আর আনন্দ। এই একটা দিন আনন্দ করা এবং পাহাড়ে উঠা নামার সামান্য চিন্তা ছাড়া তেমন কোনো কাজ ছিলোনা কারো। এদিন শেরপুর জেলায় প্রতিষ্ঠিত হওয়া ‘রক্তসৈনিক নেগেটিভ গ্রুপ-শেরপুর’ এর স্বেচ্ছাসেবকদের শুধু হাসি, গান, আড্ডা, গল্প আর দলবেধে বনের মাঝে ঘুরে বেড়ানো ও রক্তদানে উদ্বুদ্ধকরন সভা করাই যেন ছিলো একমাত্র ও উল্লেখ্যযোগ্য কাজ।
শীতের শুরুতেই আমরা বেড়াতে চলে গেলাম বাংলা-ভারত সীমান্ত নিজ জেলা শেরপুরের পর্যটন এলাকা গারো পাহাড়ের গজনী অবকাশ কেন্দ্রে। হালকা বাতাসকে পাত্তা না দিয়ে সকাল সাড়ে ৮টায় রওনা দেই সেই আনন্দময় স্থানের উদ্দেশ্যে। যাতায়াতের সুবিধার্থে ছোট ট্রাকে করে সাড়ে এগারোটায় কাঙ্খিত স্থানে পৌঁছে যায় বাধ্যযন্ত্র ও বসার স্থান ও খাবার। আমরাই হয়তোবা এদিনের জন্য শেরপুরের প্রথম ভ্রমন পিপাসু স্বেচ্ছাসেবক ছিলোম। আমরা অনেকে মোটরসাইকেলে পৌঁছানো পরেই বিভিন্ন এলাকা থেকে আরো অনেক ভ্রমন পিপাসু পৌঁছে গেলেন সেই অবকাশে।
তবে আজ হয়ত আমরাই গজনী অবকাশের সেরা দল। সাহস ও ইচ্ছা শক্তির কাছে আমরা সবাই জয়ী হয়ে পাহাড়ে উঠা শুরু করি। শুরু হলো গ্রুপে গ্রুপে এদিক সেদিক ঘুরা ঘুরি, আর যার যেমন মন চাচ্ছে ক্যামেরা বন্ধী হওয়া। ‘রক্তসৈনিক নেগেটিভ গ্রুপ’-এর স্বেচ্ছাসেবক সদস্যদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠল সারা অবকাশ কেন্দ্র। আমরা আমরাইতো, তাই বেশ মজাও হলো।

নির্দিষ্ট সময়ে ও নির্দিষ্ট স্থানে আমরা সবাই খেতে চলে গেলাম। আমরা প্রায়ই হয়তো এরকম খাবার খাই কিন্তু এতবড় অনুষ্ঠানে খোলামেলা পরিবেশে বনের গাছের নিচে বসে খাওয়ার নজির সবার জীবন ইতিহাসে কমই স্থান পেয়েছে। তাছাড়া স্বেচ্ছাসেবক এতবড় বন্ধু সমাজ নিয়ে একসাথে বসে এভাবে খাবার খাওয়া সচরাচর হয়না। খাওয়া শেষে একটু বিশ্রাম নেয়ার পালা। ঘাসের বিছানায় বা চেয়ারে বসে পান চিবানো, ছোট ছোট দল হয়ে গল্প, আড্ডা, ছবি তোলা, সুরেলা আর বে-সুরেলা গলায় গান আর অযথাই হাসাহাসি। বিশ্রাম শেষে কিছুক্ষনের জন্য শিশুদের মনখুশি করতে কেনা কাটা শুরু হলো। এরই পরেই শুরু হয় সংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এই গ্রুপের সদস্যরাই গানে গানে মাতিয়ে তোললেন এলাকা।
এরপরেই নিরাপদে রক্ত দান ও গ্রহনে বিষয়ে ‘রক্তসৈনিক নেগেটিভ গ্রুপ’ এর সমন্বয়ক মনোয়ার হোসেন লিটন-এর সভাপতিত্বে সচেতনতা মূলক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। এতে শেরপুর সদর উপজেলার মোবারক ইসলাম ও মিনাল হোসেন, নকলা উপজেলার আবু রায়হান ও নাঈম ইসলাম, নালিতাবীড়র মোশাররফ হোসেন ও রবিউল ইসলাম, শ্রীবরদীর রুবেল মিয়া, ঝিনাইগাতী উপজেলার ফরহাদ হাসান বাবুলসহ অনেকে বক্তব্য রাখেন।
বক্তারা রক্ত দাতা ও গ্রহিতাদের মধ্যে বিভিন্ন সমস্য ও সমাধের বিষয়ে আলোচনা করেন। এছাড়া দেশের সার্বিক উন্নয়নে তাদের অনেক গুলো লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য রয়েছে বলে তারা জানান। তবে সর্বস্তরের জনগণকে সাথে নিয়ে প্রথমে নিজ জেলা, অতঃপর পর্যায়ক্রমে সারা দেশকে সন্ত্রাস ও মাদক মুক্ত করার চেষ্টা অব্যহত রাখাসহ বিনামূল্যে রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা করা, রক্ত দাতাদের ডেটাবেজ সংরক্ষণ করা এবং যে কোন রোগীর প্রয়োজনে বিনামূল্যে রক্ত দিয়ে মানুষের জীবন বাচাঁনো তাদের মূল লক্ষ্য বলে বক্তারা জানান।

‘রক্তসৈনিক নেগেটিভ গ্রুপ-শেরপুর’ সমন্বয়ক মনোয়ার হোসেন লিটন জানান, শেরপুরের সবকয়টি উপজেলার নেগেটিভ গ্রæপের রক্তের স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে চলতি বছর ‘রক্তসৈনিক নেগেটিভ গ্রুপ-শেরপুর’ নামে সম্পূর্ণ একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন গঠিত হয়। এরপর থেকেই সংগঠনটি সুনামের সহিত কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। তাদের সৌজন্যে মুমুর্ষ রোগী চাহিদা অনুযায়ী নেগেটিভ গ্রুপের রক্ত পেয়ে আজ তারা সুস্থ্যভাবে জীবন যাপন করছেন। ফ্রি ব্লাড গ্রুপিং ক্যাম্প, স্বেচ্ছায় রক্তদানে উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচী পালন, রক্ত দানে উদ্বুদ্ধ করতে বিভিন্ন প্রচার পত্র বিলি করাসহ গ্রাম-গঞ্জ ও হাট বাজারের বিভিন্ন দেওয়াল ও গুরুত্বপূর্ণ জনবহুল স্থানে সচেতনতা মূলক লেখা সমৃদ্ধ পোস্টার লাগিয়ে এলাকার সকলের নজরে আনা তাদের বর্তমান কাজ। রক্তের অভাবে মৃত্যু রোধে একঝাঁক তরুণদের নিয়ে গঠিত সেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘রক্তসৈনিক নেগেটিভ গ্রুপ-শেরপুর’। জীবন রক্ষাকারী, জনসচেতনতা ও উন্নয়ন মূলক তাদের এমন কাজে সার্বিক সহযোগিতা করাসহ নিয়মিত পরামর্শ দিয়ে আসছেন জেলা-উপজেলার সুশীলজন। এমনটাই জানান সমন্বয়ক মনোয়ার হোসেন লিটন।
আলোচনা সভা চলতে চলতেই ক্রমেই দিন শেষ হতে থাকে, আমাদের মনটা বেদনায় ভারাক্রান্ত হতে থাকে। কারন ফিরার সময় হয়ে আসে। সবাই ফিরার জন্য প্রস্তুতির আগেই আমাদের এই ভ্রমনকে স্মৃতি হিসেবে ধরে রাখতে সবাই ফটো সেশনে অংশ নেন। স্মৃতিচারণ মূলক ফটো সেশনে অংশ গ্রহনকারীদের মধ্যে নকলা প্রেসক্লাবের সভাপতি মো. মোশারফ হোসাইন ও দপ্তর সম্পাদক সেলিম রেজাসহ ‘রক্তসৈনিক নেগেটিভ গ্রুপ-শেরপুর’ এর ৫টি উপজেলার আনসার-ভিডিবি’র মৌলিক প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত নেগেটিভ রক্তের তরুণ স্বেচ্ছাসেবকরা ছিলেন।
ভ্রমন পিপাসু ‘রক্তসৈনিক নেগেটিভ গ্রুপ-শেরপুর’ এর আনসার-বিডিবি’র মৌলিক প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত নেগেটিভ রক্তের তরুণ স্বেচ্ছাসেবকরা মিলে ২১ নভেম্বর শুক্রবার বিশাল বহরে মাতিয়ে রেখেছেন বাংলা-ভারত সীমান্ত জেলা শেরপুরের পর্যটন এলাকা গারো পাহাড়ের গজনী অবকাশ কেন্দ্রটি। তাই দিনটি হয়তো অনেকের কাছেই স্মরনীয় হয়ে থাকবে বলে মনে করছেন ভ্রমন পিপাসু ওইসব প্রকৃতি প্রেমী স্বেচ্ছাসেবকগন।