আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদীয় আসন ১৪৪ শেরপুর-২ (নকলা-নালিতাবাড়ী) এর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)’র মনোনীত প্রার্থী মোহাম্মদ ফাহিম চৌধুরী’র মনোনয়নপত্র আবারো স্থগিত করা হয়েছে। তিনি ৯ জানুয়ারি শুক্রবার দুপুরের দিকে মনোনয়নপত্রের বৈধতা চেয়ে আপিল করেছিলেন।
সোমবার ১২ জানুয়ারি দুপুরের দিকে মনোনয়নের বৈধতা চেয়ে করা আপিলের শুনানি শেষে তা স্থগিত করে আপিল বিভাগ। ১৬ জানুয়ারি শুক্রবার আপিল নিষ্পত্তির জন্য পুনরায় শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে। সেদিন মোহাম্মদ ফাহিম চৌধুরী’র মনোনয়নপত্র বৈধতা পাবে বলে আশাবাদী নকলা-নালিতাবাড়ীর নেতাকর্মীরা।
মোহাম্মদ ফাহিম চৌধুরী’র কর্মী-সমর্থকরা তাদের নেতার মনোনয়নপত্র বৈধতা পবে এমন আশা ব্যক্ত করে নিজ নিজ টাইম লাইনে আশারবানী পোস্ট করেন। তারা সবাই লেখেন, ‘শেরপুর-২ আসনের গর্ব, মরহুম আলহাজ্ব জাহেদ আলী চৌধুরীর সুযোগ্য উত্তরসূরি ইঞ্জিনিয়ার ফাহিম চৌধুরীর মনোনয়ন নিয়ে যারা বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছেন, তাদের উদ্দেশ্য করে বর্তমান পরিস্থিতির প্রকৃত আইনি ব্যাখ্যা নিচে দেওয়া হলো:
আইনি লড়াইয়ের দৃঢ়তা:
আমরা পরিষ্কারভাবে বলতে চাই, নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। যদিও বর্তমানে দ্বৈত নাগরিকত্ব ইস্যুতে একটি জটিলতা তৈরি হয়েছে, কিন্তু এটিই শেষ কথা নয়। আগামী ১৬ তারিখ পর্যন্ত কমিশন আপিল নিষ্পত্তির সময় বেঁধে দিয়েছেন। যদি সেখানে কোনো কারণে ন্যায়বিচার বাধাগ্রস্ত হয়, তবে আমাদের জন্য উচ্চ আদালতের দরজা উন্মুক্ত রয়েছে।
রিট পিটিশন ও আদালতের এখতিয়ার:
নির্বাচন কমিশনের রায়ে সন্তুষ্ট না হলে আমরা সরাসরি হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করবো। ইঞ্জিনিয়ার ফাহিম চৌধুরী ইতোমধ্যে অস্ট্রেলিয়া অ্যাম্বাসি ও সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা ও অকাট্য দালিলিক প্রমাণ সংগ্রহ করেছেন। আমরা আত্মবিশ্বাসী যে, আদালত যখন এই প্রামাণ্য দলিলগুলো দেখবেন, তখন তিনি শতভাগ সন্তুষ্ট হয়ে প্রার্থিতা ফিরিয়ে দেবেন।
প্রয়োজনে নির্বাচন স্থগিতের লড়াই:
আমরা নকলা-নালিতাবাড়ীর মানুষের ভোটাধিকার রক্ষায় অঙ্গীকারবদ্ধ। যদি আইনি প্রক্রিয়া দীর্ঘ হয়, তবে ইঞ্জিনিয়ার ফাহিম চৌধুরীকে ছাড়া এই আসনে নির্বাচন হতে দেওয়া হবে না। প্রয়োজনে আদালতের মাধ্যমে নির্বাচন স্থগিত রাখার আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জেতার স্বপ্ন যারা দেখছেন, তাদের স্বপ্ন সফল হবে না।
বিভ্রান্ত হবেন না:
ইঞ্জিনিয়ার ফাহিম চৌধুরীর হাতে যে অকাট্য প্রমাণগুলো রয়েছে, তা দিয়ে আদালতের মাধ্যমে ১০০% প্রার্থিতা ফিরে পাওয়া সম্ভব। সুতরাং, প্রতিপক্ষের কোনো প্রোপাগান্ডা বা গুজবে কান দেবেন না।
জনগণের প্রতি বার্তা:
আমরা নকলা-নালিতাবাড়ীর মানুষের ভোটাধিকার রক্ষায় শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাব। কোনো ষড়যন্ত্রই জাহেদ আলী চৌধুরীর উত্তরসূরিকে জনগণের অধিকার আদায়ের পথ থেকে সড়াতে পারবে না। ধৈর্য ধরুন, ঐক্যবদ্ধ থাকুন এবং প্রিয় নেতার জন্য দোয়া করুন। সত্যের সূর্য উদিত হবেই। জয় আমাদের সুনিশ্চিত, ইনশাআল্লাহ।’
এর আগে ৩ জানুয়ারি শনিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত জেলা রিটার্নিং অফিসার ও জেলা প্রশাসক তরফদার মাহমুদুর রহমান তাঁর কার্যালয়ে যাচাই-বাছাই শেষে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী’র মনোনীত প্রার্থী মো. গোলাম কিবরিয়া ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ’র মনোনীত প্রার্থী মো. আব্দুল্লাহ আল কায়েস-এর মনোনয়নপত্র বৈধ বলে ঘোষণা করেন। এছাড়া দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকায় সংশ্লিষ্ট যথাযথ কাগজপত্র সংযুক্ত না করায় বিএনপি’র মনোনীত প্রার্থী মোহাম্মদ ফাহিম চৌধুরী’র মনোনয়নপত্র স্থগিত করা হয়। এর পরে ৯ জানুয়ারি শুক্রবার দুপুরের দিকে মনোনয়নপত্র বৈধতা চেয়ে প্রয়োজনীয় কাজপত্রসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আপিল করেন তিনি।
অন্যদিকে বিএনপি’র মনোনীত প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা করলেও দলীয় মনোনয়নের প্রমাণক হিসেবে প্রয়োজনীয় কাজগপত্র সংযুক্ত না থাকায় ও দ্বৈত নাগরিকত্ব¡ থাকায় সংশ্লিষ্ট প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংযুক্ত না করায় ইলিয়াস খান-এর মনোনয়নপত্র এবং ঋণ খেলাপীর কারণে জাতীয় পার্টির মনোনীত প্রার্থী মো. রফিকুল ইসলাম বেলাল-এর মনোনয়নপত্র বাতিল হিসেবে গণ্য করা হয়।
একাধিক সূত্র জানায়, ইলিয়াস খান দলীয় মনোনয়ন নহে বরং স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা করেছিলেন। তবে দ্বৈত নাগরিকত্ব¡ বর্জনের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংযুক্ত না করায় এবং শেরপুর-২ আসনের মোট ভোটের ১% ভোটারের অনুমতির প্রমান স্বরূপ তাদের স্বাক্ষর সম্বলিত কপি জমা না দেওয়ায় তার মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছিলো। তিনি সকল কাগজপসহ যথাযথ দপ্তরে আপিল করেছেন। আগামীকাল মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) তার আপিলের শুনানি করা হবে। ইলিয়াস খানের কর্মী-সমর্থকরা জানান, চলমান আপিলের শুনানি পরবর্তী মনোনয়নপত্র বৈধতা পাওয়ার অভিজ্ঞাতা থেকে আশা করছেন তাদের নেতার মনোনয়নপত্র বৈধতা পেতে পারে। যদিও অনেকে ইলিয়াস খানের মনোনয়নপত্র শুনানিতে বৈধতা পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ বলে মন্তব্য করছেন।
কেউ কেউ আশঙ্কা করে জানান, বিএনপি’র মনোনীত প্রার্থী মোহাম্মদ ফাহিম চৌধুরী ও স্বতন্ত্র প্রার্থী ইলিয়াস খানের মনোনয়নপত্র শেষ পর্যন্ত বৈধতা না পেলে, তখন নকলা-নালিতাবাড়ীর নির্বাচনের চিত্র ভিন্ন হতে পারে! এ বিষয়ে নারী-পুরুষ অনেক ভোটারের সথে কথা হলে তারা জানান, বিএনপির দুইজনের মধ্যে কেউই নির্বাচন করতে নাপারলে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ’র প্রার্থীরাই নির্বাচন করবেন। মূলত এই দুটি ইসলামী রাজনৈতিক দল। শান্তি বজায়ে ও অর্থনৈতিক অপচয়ের কথা বিবেচনা করে যেকোন ভাবে তাদের দুইজনের মধ্যে সমঝোতা হয়ে গেলে, তখন শেরপুর-২ আসন থেকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় এমপি নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে বলে অনেকে মন্তব্য করেন।
উল্লেখ্য, জেলার তিনটি সংসদীয় আসনে ৩০ জন সম্ভাব্য প্রার্থী মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করলেও জমা করেছিলেন ১৬ জন। মনোনয়ন দাখিলকারী ১৬ প্রার্থীর মধ্যে ১০ জনের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণার পাশাপাশি এক প্রার্থীর মনোনয়ন স্থগিত ও অপর ৫ প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে। তথ্য মতে, শেরপুর-১ (১৪৩, শেরপুর সদর উপজেলা) আসনে ৭ জনের মধ্যে ৪ জনের মনোনয়নপত্র, শেরপুর-২ (১৪৪, নকলা ও নালিতাবাড়ী উপজেলা) আসনে ৫ জনের মধ্যে ২ জনের মনোনয়নপত্র ও শেরপুর-৩ (১৪৫, শ্রীবরদী ও ঝিনাইগাতী উপজেলা) আসনে ৪ জনের সবার মনোনয়নপত্র বৈধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, নির্বাচন কমিশন কর্তৃক ঘোষিত তফসিল মোতাবেক আপিল নিষ্পত্তি করা হবে ১০ জানুয়ারি থেকে ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত। প্রার্থীতা প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ২০ জানুয়ারি। রিটার্নিং কর্মকর্তা চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করাসহ প্রতীক বরাদ্দ করবেন ২১ জানুয়ারি। নির্বাচনি প্রচারণা শুরু হবে ২২ জানুয়ারি থেকে এবং প্রচারনা চালানো যাবে ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা (০৭:৩০মিনিট) পর্যন্ত। আর ভোট গ্রহণ করা হবে ১২ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে সাতটা (০৭:৩০মিনিট) হতে বিকেল সাড়ে ৪টা (০৪:৩০মিনিট) পর্যন্ত।